পাহাড়ের ঢালজুড়ে আনারসের সমুদ্র, নতুন সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশ

প্রকাশঃ জুন ২৮, ২০২৬ সময়ঃ ১১:৩৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১১:৩৬ অপরাহ্ণ

বর্ষা মৌসুম এলেই রাঙামাটির পাহাড় যেন সবুজের নতুন রূপ ধারণ করে। সেই সবুজের মাঝেই সারি সারি আনারসের বাগান দৃষ্টি কাড়ে যে কারও। বিশেষ করে জেলার জনপ্রিয় ‘হানিকুইন’ বা ‘মধু রানী’ জাতের আনারস এবার বাম্পার ফলন দিয়েছে। সুগন্ধ, রসালো স্বাদ ও মিষ্টতার কারণে এই জাতের আনারস স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও ব্যাপক চাহিদা তৈরি করেছে।

রাঙামাটির সদর, নানিয়ারচর, কাউখালী, লংগদু ও বাঘাইছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলার পাহাড়ি ঢালজুড়ে এবার আনারসের চাষ বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখানকার পাহাড়ি মাটি ও আবহাওয়া আনারস চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। জেলায় মূলত ‘জায়ান্ট কিউ’ ও ‘হানিকুইন’ জাতের আনারস উৎপাদিত হলেও স্বাদ, সুগন্ধ ও বাজারমূল্যের দিক থেকে হানিকুইন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

নানিয়ারচরের বুড়িঘাট এলাকার চাষি সুরেশ চাকমা জানান, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার আনারসের আকার ও মিষ্টতা দুটোই ভালো হয়েছে। ফলে বাজারে আগের বছরের তুলনায় বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। জুম চাষের পাশাপাশি অনেক কৃষক এখন বাণিজ্যিকভাবে আনারস উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

আনারসের মৌসুমে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। ভোর থেকেই পাহাড়ি এলাকা থেকে কলাপাতায় মোড়ানো কিংবা বাঁশের ঝুড়িতে ভরে আনারস বাজারে নিয়ে আসছেন কৃষকেরা। সেখান থেকে পাইকাররা ট্রাক ও নৌপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফল পাঠাচ্ছেন।

চট্টগ্রামের এক পাইকারি ফল ব্যবসায়ী জানান, রাঙামাটির হানিকুইন আনারসের চাহিদা রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে অনেক বেশি। এর মিষ্টি স্বাদ ও মনোরম সুবাসের কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আনারস দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

একসময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা ছিল জুম চাষ। তবে বর্তমানে অনেক পরিবার ফল চাষের দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে আনারস চাষ থেকে ভালো লাভ হওয়ায় অনেক কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, এক একর জমিতে আনারস উৎপাদনে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হলেও অনুকূল মৌসুমে বিক্রি করে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব হয়। এই অতিরিক্ত আয় দিয়ে অনেকেই সন্তানদের লেখাপড়া, ঘর নির্মাণ ও পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করছেন।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতাও। কৃষকদের অভিযোগ, জেলায় এখনো আধুনিক হিমাগারের ব্যবস্থা না থাকায় পাকা আনারস দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। সময়মতো বাজারজাত করা না গেলে ফল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, ফলে অনেক সময় কম দামে বিক্রি করতে হয়।

এ ছাড়া দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে মূল সড়ক বা বাজার পর্যন্ত আনারস পরিবহনে অতিরিক্ত খরচও কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং লাভও বাড়বে।

স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, রাঙামাটিতে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলা গেলে উদ্বৃত্ত আনারস দিয়ে জুস, জ্যাম, জেলিসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাঙামাটি জেলায় ২ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৩৪ মেট্রিক টন ফলন ধরে মোট উৎপাদন হয়েছে ৯০ হাজার ৪৩৯ মেট্রিক টন। আগের অর্থবছরের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২৪ হাজার ৮৬৫ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে জেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে, যার বড় অংশই হানিকুইন জাতের।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, কৃষকদের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে আনারস চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রাসায়নিক ও ক্ষতিকর হরমোনের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ ফল উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ি ঢালে মাটির ক্ষয় রোধে বিশেষ চাষপদ্ধতিও শেখানো হচ্ছে।

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেন, হানিকুইন আনারস ইতোমধ্যে রাঙামাটির একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বড় চেইনশপ ও করপোরেট ক্রেতাদের সঙ্গে তাদের সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলায় একটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনের প্রস্তাবও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

August 2026
SSMTWTF
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031 
20G