১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতায় মেটা, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে আসছে বড় পরিবর্তন
কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলা একাধিক মামলার অবসান ঘটাতে প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমঝোতায় পৌঁছেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা। এই সমঝোতার অংশ হিসেবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারবিধি এবং বিভিন্ন নকশাগত বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল, কিশোরদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার মতোভাবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব প্ল্যাটফর্মের কারণে তরুণদের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবের তথ্য যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়নি বলেও অভিযোগ ওঠে। ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও মামলায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে গেলেও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরিবর্তে সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে মেটা। তবে বিপুল অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো আইন ভঙ্গ বা অনিয়মের দায় স্বীকার করেনি। মেটার বক্তব্য, তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে প্ল্যাটফর্ম দুটিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে।
কেন এত বড় অঙ্কের সমঝোতা?
মেটার জন্য সাম্প্রতিক কয়েকটি আদালতের সিদ্ধান্ত আইনি ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গত মার্চে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি আদালত একটি শিশুর ক্ষতির ঘটনায় মেটা ও ইউটিউবকে দায়ী করে রায় দেন। একই সময়ে নিউ মেক্সিকোর একটি মামলায় তরুণদের ক্ষতির অভিযোগে মেটাকে দায়ী করা হয় এবং ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে আগস্টে সেই অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার করা হয়।
চলমান মামলাগুলোতে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য মেটার কাছ থেকে আরও বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করছিল। রাজ্যগুলোর হিসাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য জরিমানা ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার আর্থিক ঝুঁকি, পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে সমঝোতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মেটা।
অন্যদিকে অঙ্গরাজ্যগুলোও এই সমঝোতার মাধ্যমে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ নয়, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা এবং ব্যবহারবিধিতে পরিবর্তন আনার সুযোগ পাচ্ছে।
কীভাবে দেওয়া হবে অর্থ?
সমঝোতার অর্থ একবারে পরিশোধ করা হবে না। মেটা আগামী এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি রাজ্য ও বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য প্রায় ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে।
এর বাইরে টেক্সাসের সঙ্গে পৃথক চুক্তির আওতায় দেওয়া হবে ১ বিলিয়ন ডলার। আর টিকটক, ইউটিউব ও স্ন্যাপের মতো অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও একই ধরনের নিয়ম গ্রহণ করে এবং নিজেদের অংশের অর্থ প্রদান করলে মেটার কাছ থেকে আরও ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের বিষয়টি কার্যকর হবে।
কিশোরদের জন্য বদলাচ্ছে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম
নতুন নিয়মের আওতায় ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য রাতের সময়ে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আসবে। মধ্যরাত থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত প্ল্যাটফর্ম দুটিতে প্রবেশ বন্ধ থাকবে। এছাড়া রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কোনো নোটিফিকেশন পাঠানো হবে না।
দুই প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে একজন কিশোর দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা ব্যবহার করতে পারবে। তবে ২২ মিনিটের বেশি সময়ের ভিডিও দেখা কিংবা বার্তা আদান-প্রদানের সময় এই ব্যবহারের সীমার মধ্যে ধরা হবে না।
একজন কিশোর একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করলেও দৈনিক সময়সীমা বাড়বে না। মেটা ফোন নম্বর ও ব্যবহারকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে একই ব্যক্তির একাধিক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে সময় গণনার আওতায় আনবে।
স্কুলের সময়েও নোটিফিকেশন বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ৬০ ও ৯০ মিনিট ব্যবহারের পর বিরতি নেওয়ার জন্য ব্যবহারকারীকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে। টানা ১৫ মিনিট স্ক্রল করলেও সতর্কবার্তা দেখানো হবে। এসব নিয়ন্ত্রণমূলক সেটিং পরিবর্তনের ক্ষমতা কেবল অভিভাবকদের হাতে থাকবে।
অ্যাপের নকশাতেও পরিবর্তন
শুধু ব্যবহারের সময় নয়, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কিছু দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যও বদলানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পোস্টে কতজন লাইক দিয়েছেন, সেই সংখ্যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে গোপন রাখার ব্যবস্থা থাকবে।
এ ছাড়া ব্যবহারকারীর বয়স যাচাই আরও কঠোর করা হবে। বয়স নির্ধারণে বড় ধরনের ভুল হলে মেটাকে আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে।
কোনো ক্ষতিকর কনটেন্ট সম্পর্কে অভিযোগ করা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়মও রাখা হচ্ছে। এ ধরনের রিপোর্ট পাওয়ার ছয় ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আত্মহত্যা বা গুরুতর খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষতিকর বিষয় কেউ বারবার খুঁজলে অভিভাবককে সতর্ক করার ব্যবস্থাও থাকবে। মেটার নিরাপত্তা কার্যক্রম একজন স্বাধীন পর্যবেক্ষক পাঁচ বছর ধরে নজরদারি করবেন।
অন্য দেশেও পড়তে পারে প্রভাব
কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিভিন্ন দেশ এরই মধ্যে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতার ক্ষেত্রে অবশ্য পুরোপুরি ব্যবহার বন্ধের বদলে বয়স যাচাই, সময়সীমা এবং অ্যাপের নকশা পরিবর্তনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে ব্যবহারকারীর প্রকৃত বয়স নিশ্চিত করার প্রযুক্তি ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশেও আলোচনার বিষয় হতে পারে। পাসপোর্ট বা সরকারি নথি ব্যবহার না করেও নির্ভুলভাবে বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা অন্য দেশগুলোর নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্য প্ল্যাটফর্মগুলো কী করবে?
এই সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, মেটার অনুসরণ করে অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোও একই ধরনের বিধিনিষেধ গ্রহণ করবে কি না।
মেটার পরিকল্পনা অনুযায়ী, অতিরিক্ত ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থ পরিশোধের বিষয়টি নির্ভর করবে টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইউটিউবের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলো একই নিয়ম গ্রহণ করে কি না তার ওপর।
মেটা ইতোমধ্যে একটি খোলা চিঠিতে অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে কিশোরদের সুরক্ষায় একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এখন নজর থাকবে, আগামী দিনগুলোতে অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এই প্রস্তাবে সাড়া দেয় কি না এবং কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য কতটা পরিবর্তন বাস্তবে কার্যকর হয়।
প্রতি / এডি / শাআ



















