আফ্রিকার রহস্যময় হ্রদ, যেখানে মৃত প্রাণীগুলোকে দেখায় পাথরের মূর্তির মতো
২০১৩ সালে প্রকাশিত কয়েকটি সাদাকালো ছবি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আলোকচিত্রী নিক ব্র্যান্ডটের –এর তোলা সেই ছবিতে দেখা যায়, হ্রদের তীরে বসে থাকা পাখি ও বাদুড় যেন পাথরে পরিণত হয়েছে। ছবিগুলো দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন, কোনো রহস্যময় শক্তির প্রভাবে প্রাণীগুলো মুহূর্তেই পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে ভিন্ন।
পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়াতে অবস্থিত লেক ন্যাট্রন পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত ও ভয়ংকর হ্রদগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। দেখতে শান্ত ও সুন্দর হলেও এর পানি অত্যন্ত ক্ষারীয়, লবণাক্ত এবং অস্বাভাবিক গরম।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির পানির তাপমাত্রা কখনো কখনো প্রায় ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে এই পানিতে সরাসরি পড়লে প্রাণীর শরীরে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। শুধু তাই নয়, পানির পিএইচ মাত্রাও অত্যন্ত বেশি, যা অনেকটা শক্তিশালী রাসায়নিক ক্লিনারের মতো ক্ষয়কারী বৈশিষ্ট্য তৈরি করে।
এই হ্রদের পানিতে অতিরিক্ত লবণ ও খনিজ থাকার পেছনে রয়েছে কাছাকাছি অবস্থিত ওল দোইনিয়ো লেঙ্গাই আগ্নেয়গিরি। আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত বিভিন্ন খনিজ উপাদান উষ্ণ প্রস্রবণের মাধ্যমে হ্রদে মিশে যায়। প্রচণ্ড তাপ ও দ্রুত বাষ্পীভবনের কারণে পানিতে লবণের ঘনত্ব আরও বেড়ে যায়।
হ্রদটির আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এর রক্তিম রঙ। মূলত হ্যালোআর্কিয়া নামে একধরনের অণুজীব এবং বিশেষ ধরনের শৈবালের কারণে পানির রঙ লালচে দেখায়। প্রতিকূল পরিবেশ হওয়া সত্ত্বেও কিছু প্রাণী এখানে টিকে থাকতে সক্ষম। বিশেষ করে লেসার ফ্লেমিঙ্গো পাখির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল। কারণ অন্য শিকারি প্রাণীরা এই পরিবেশে সহজে টিকে থাকতে পারে না।
তবে হ্রদটি প্রাণঘাতীও বটে। পানির আয়নার মতো প্রতিফলনের কারণে অনেক পরিযায়ী পাখি বিভ্রান্ত হয়ে সরাসরি পানিতে পড়ে যায়। একবার পানিতে পড়লে অতিরিক্ত লবণ ও ক্ষারীয় উপাদানের কারণে তাদের বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অনেকে মনে করেন, হ্রদে পড়েই প্রাণীগুলো পাথরে পরিণত হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি আসলে “প্রাকৃতিক মমি” হওয়ার একটি প্রক্রিয়া। পানিতে থাকা ন্যাট্রন নামের লবণ প্রাণীর দেহ থেকে আর্দ্রতা ও চর্বি শুষে নেয়। ফলে মৃতদেহ শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায় এবং দেখতে পাথরের মতো লাগে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আলোচিত ছবিগুলোতে প্রাণীগুলোকে যেভাবে দেখা গেছে, তা পুরোপুরি প্রাকৃতিক অবস্থার ছবি নয়। আলোকচিত্রী নিক ব্র্যান্ডট নিজেই পরে জানান, হ্রদের তীরে পাওয়া মৃত প্রাণীগুলোকে তিনি ডালপালায় এমনভাবে সাজিয়েছিলেন, যাতে সেগুলো জীবন্ত মূর্তির মতো দেখায়। তাঁর এই শৈল্পিক উপস্থাপনাই ছবিগুলোকে আরও রহস্যময় করে তোলে।
তাই লেক ন্যাট্রনকে ঘিরে যত গল্পই থাকুক না কেন, বাস্তবে এখানে কেউ মুহূর্তেই পাথরে পরিণত হয় না। তবে এর অত্যন্ত ক্ষারীয় ও গরম পানি যে প্রাণঘাতী, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
প্রতি / এডি / শাআ













