পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা ঘটাতে চাঁদের ভূমিকা কী ?

প্রকাশঃ আগস্ট ৩০, ২০২৬ সময়ঃ ১০:৩৬ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:৩৬ অপরাহ্ণ

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে থাকলে একটি বিষয় সহজেই চোখে পড়ে। কিছু সময় পরপর সাগরের পানি তীরের দিকে এগিয়ে আসে, আবার ধীরে ধীরে সরে যায়। সমুদ্রের পানির এই নিয়মিত ওঠানামাই জোয়ার-ভাটা নামে পরিচিত। তবে এটি কেবল কক্সবাজারের দৃশ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সাগর ও মহাসাগরেই নিয়মিত এই পরিবর্তন ঘটে।

জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে এবং পানি ধীরে ধীরে তীরের দিকে উঠে আসে। নির্দিষ্ট সময় পর পানির স্তর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এটিই ভরা জোয়ার। এরপর পানি কমতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে সমুদ্রের স্তর অনেকটা নিচে নেমে যায়। এই পর্যায়কে বলা হয় ভাটা। বড় নদী ও হ্রদের ক্ষেত্রেও, বিশেষ করে সাগরের সঙ্গে সংযোগ থাকলে, জোয়ার-ভাটার প্রভাব দেখা যেতে পারে।

কিন্তু এত বিশাল জলরাশি নিয়মিতভাবে কেন ওঠানামা করে? এর প্রধান কারণ খুঁজে পাওয়া যায় পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদের মধ্যে।

পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। এত দূরে অবস্থান করলেও চাঁদের নিজস্ব মহাকর্ষীয় আকর্ষণ রয়েছে। এই আকর্ষণের প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন বস্তুর ওপর পড়ে। বিশেষ করে বিশাল জলরাশির ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

চাঁদের আকর্ষণে সাগরে জোয়ার

পৃথিবীর যেমন মহাকর্ষ বল রয়েছে, তেমনি চাঁদেরও রয়েছে। পৃথিবীর মহাকর্ষের তুলনায় চাঁদের আকর্ষণ অনেক দুর্বল হলেও সাগরের বিপুল পরিমাণ তরল পানিকে প্রভাবিত করার জন্য তা যথেষ্ট।

চাঁদের মহাকর্ষীয় টানে পৃথিবীর চাঁদের দিকে থাকা সমুদ্রের পানি কিছুটা চাঁদের দিকে সরে গিয়ে পানির স্তর উঁচু করে। এর ফলে ওই অঞ্চলে জোয়ার তৈরি হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে চাঁদের অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে এই পানির উচ্চতাও নিয়মিত বদলাতে থাকে।

সাধারণভাবে একটি জোয়ার থেকে পরবর্তী জোয়ারের ব্যবধান প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। ফলে অনেক উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিটের মধ্যে দুটি জোয়ার ও দুটি ভাটা দেখা যায়। তবে সব জায়গায় সময়ের ব্যবধান বা জোয়ারের উচ্চতা একরকম নয়। উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রের গভীরতা এবং স্থানীয় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও এতে প্রভাব ফেলে।

চাঁদের বিপরীত পাশেও কেন জোয়ার হয়?

চাঁদের দিকে থাকা অংশে জোয়ার হওয়ার বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু পৃথিবীর ঠিক বিপরীত পাশেও কেন জোয়ার তৈরি হয়, সেটিই তুলনামূলকভাবে বেশি কৌতূহলের বিষয়।

পৃথিবী ও চাঁদ একটি যৌথ মহাকর্ষীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করে। এই ব্যবস্থার গতির কারণে পৃথিবীর চাঁদের বিপরীত দিকের পানিতেও একটি জোয়ারের স্ফীতি তৈরি হয়। ফলে পৃথিবীর বিপরীত দুই পাশে প্রায় একই সময়ে জোয়ারের অঞ্চল তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে এই দুই উঁচু পানির অঞ্চলের মাঝামাঝি অংশে পানির স্তর তুলনামূলকভাবে কমে যায়। সেখানেই দেখা দেয় ভাটা।

জোয়ার-ভাটায় সূর্যের প্রভাব কতটা?

জোয়ার-ভাটার জন্য শুধু চাঁদ দায়ী নয়। সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণও সমুদ্রের পানিকে প্রভাবিত করে। সূর্য চাঁদের তুলনায় অনেক বেশি ভরযুক্ত হলেও পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব অনেক বেশি। তাই জোয়ার-ভাটার ওপর চাঁদের প্রভাব সূর্যের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নির্দিষ্ট সময়ে সূর্য ও চাঁদের আকর্ষণ একসঙ্গে কাজ করলে জোয়ারের উচ্চতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করে। তখন দুই মহাজাগতিক বস্তুর আকর্ষণ পরস্পরকে শক্তিশালী করে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উচ্চতার জোয়ার দেখা যায়। একে বলা হয় ভরা জোয়ার বা স্প্রিং টাইড।

অন্যদিকে চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের সঙ্গে প্রায় সমকোণ তৈরি করে, তখন সূর্য ও চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাব একে অপরের বিপরীতভাবে কাজ করে। এতে জোয়ারের উচ্চতা তুলনামূলকভাবে কমে যায়। এই অবস্থাকে বলা হয় মরা জোয়ার বা নিপ টাইড।

নদীতে জোয়ার-ভাটা হয় কেন?

সাগরের পাশাপাশি বাংলাদেশের অনেক নদীতেও জোয়ার-ভাটার দৃশ্য দেখা যায়। এর প্রধান কারণ নদীর সঙ্গে সাগরের সংযোগ।

সাগরে জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি নদীর মোহনা দিয়ে ভেতরের দিকে প্রবেশ করে। ফলে নদীর পানির স্তরও বেড়ে যায়। আবার ভাটার সময় পানি সাগরের দিকে ফিরে গেলে নদীর পানির স্তর কমতে থাকে।

তাই নদীতে দেখা জোয়ার-ভাটাকে শুধু নদীর পানির ওপর চাঁদের সরাসরি আকর্ষণের ফল হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। নদীর সঙ্গে সমুদ্রের সংযোগ এবং উপকূলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পৃথিবীর সাগর-মহাসাগরে জোয়ার-ভাটার প্রধান নিয়ন্ত্রক চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। এর সঙ্গে সূর্যের আকর্ষণ এবং পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থার গতিও যুক্ত হয়ে জোয়ার-ভাটার উচ্চতা ও সময়ের ধরনকে প্রভাবিত করে। প্রতিদিনের এই স্বাভাবিক ওঠানামার পেছনে তাই কাজ করছে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় সম্পর্ক।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G