আবারও চালু হচ্ছে ‘বিশ্বযুদ্ধের কারণ’ হয়ে ওঠা সেই খনি

প্রকাশঃ আগস্ট ২২, ২০২৬ সময়ঃ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

যুদ্ধের সঙ্গে অদ্ভুত এক সম্পর্ক রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কিং আইল্যান্ডের ডলফিন মাইনের। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে যুদ্ধের প্রয়োজন বাড়লে খনিটি সচল হয়েছে, আর পরিস্থিতি শান্ত হলে থেমে গেছে এর কার্যক্রম। এবার বিশ্বজুড়ে টাংস্টেনের চাহিদা বাড়তে থাকায় আবারও উৎপাদনে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে খনিটিকে।

কিং আইল্যান্ডে অবস্থিত ডলফিন মাইনকে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য টাংস্টেনের মজুতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টাংস্টেন অত্যন্ত শক্ত ও তাপসহনশীল ধাতু। সামরিক খাতে এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেপণাস্ত্র, বর্ম-ভেদী গোলাবারুদ এবং সাঁজোয়া যানসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে ধাতুটির প্রয়োজন হয়।

যুদ্ধ এলেই খুলেছে খনির দরজা

ডলফিন মাইনের ইতিহাসের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধের সময়কার সামরিক চাহিদার সরাসরি যোগ রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অস্ত্র উৎপাদনে টাংস্টেনের প্রয়োজন বেড়ে যাওয়ায় ১৯১৭ সালে খনিটির কার্যক্রম শুরু হয়। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বাজার পরিস্থিতি বদলে যায়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই খনিটি বন্ধ হয়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হলে আবারও টাংস্টেনের চাহিদা বাড়তে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে ১৯৩৮ সালে ডলফিন মাইন পুনরায় চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও খনিটির কার্যক্রম পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কখনো চালু হয়েছে, কখনো বন্ধ হয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় বিশ্বজুড়ে অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক প্রস্তুতি বাড়ায় টাংস্টেনের প্রয়োজনও ছিল উল্লেখযোগ্য। ফলে খনিটি আবার কিছু সময়ের জন্য সক্রিয় থাকে। কিন্তু ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর পতনের পর বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। এর পরের বছর খনিটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘ সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় খনিটির বিশাল খোলা অংশে পানি জমে যায়। প্রায় তিন দশক পর ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সেটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। আশ্চর্যের বিষয়, এর কয়েক সপ্তাহ পরই রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে।

এবার লক্ষ্য বড় পরিসরে উৎপাদন

২০২৬ সালে এসে ডলফিন মাইনকে ঘিরে আবারও তৎপরতা বাড়ছে। ভূগর্ভ থেকে টাংস্টেন আকরিক উত্তোলনের প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেপ্টেম্বর থেকে প্রথম আকরিক উত্তোলন ও সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের অন্যতম কারণ টাংস্টেনের সম্ভাব্য বাড়তি চাহিদা। বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎপাদন বাড়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই ধাতুর বাজার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা

ডলফিন মাইনকে ঘিরে নতুন করে আগ্রহের পেছনে শুধু যুদ্ধ নয়, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বে টাংস্টেন উৎপাদনের বড় অংশই চীনের নিয়ন্ত্রণে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই ধাতুর সরবরাহে একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চাইছে পশ্চিমা দেশগুলো।

চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কাও এ ক্ষেত্রে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সরাসরি সংঘাত তৈরি হলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীনের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনও বিভিন্ন সময়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কৌশলগত কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ওয়াশিংটন।

টাংস্টেনের দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রও

চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রও বিকল্প উৎস খুঁজছে। এরই অংশ হিসেবে কাজাখস্তানে থাকা বড় একটি টাংস্টেনের মজুত থেকে খনিজ উত্তোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বড় অঙ্কের একটি চুক্তি করেছে। চুক্তিটির মূল্য প্রায় ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার বলে জানা গেছে।

সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে টাংস্টেনের গুরুত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ধাতুটির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন উপাদান তৈরিতে এর ব্যবহার রয়েছে।

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবরও সামনে এসেছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এমন ঘাটতির বিষয়টি অস্বীকার করেছে, একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রস্তুতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কৌশলগত খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতা টাংস্টেনকে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আর সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই এক শতাব্দীর বেশি পুরোনো ডলফিন মাইন আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G