বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নানা পণ্য তৈরির উদ্যোগ

প্রকাশঃ আগস্ট ৮, ২০২৬ সময়ঃ ১০:২৫ অপরাহ্ণ.. সর্বশেষ সম্পাদনাঃ ১০:২৯ অপরাহ্ণ

সকালে পরিচ্ছন্ন দেখালেও দিনের শেষভাগে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, ফুটপাত ও আশপাশের এলাকায় জমে ওঠে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য। আধুনিক নগর অবকাঠামোর পাশাপাশি প্লাস্টিক, পচা খাবারের উচ্ছিষ্ট ও আবর্জনার স্তূপ ঢাকার পরিবেশ ও জনজীবনে তৈরি করছে নানা সমস্যা। ধুলা, দুর্গন্ধ এবং বর্জ্য থেকে নির্গত বিভিন্ন গ্যাসের কারণে নগরবাসীর ভোগান্তিও বাড়ছে।

প্রতিদিনের বিপুল বর্জ্য সামাল দিতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার দিকে যাচ্ছে সরকার। এত দিন বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের যে পরিকল্পনা ছিল, তার পাশাপাশি এবার বর্জ্য না পুড়িয়ে বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

সংশ্লিষ্টদের আশা, পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নগরীর বর্জ্য আর শুধু পরিবেশের বোঝা হয়ে থাকবে না। বরং সেটিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার ও অন্যান্য পণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

এসটিএস থাকলেও কমেনি বর্জ্যের সমস্যা

রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ২০১৬ সাল থেকে দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক স্থানান্তর কেন্দ্র বা এসটিএস তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে অনেক জায়গায় আগের উন্মুক্ত ডাস্টবিন ও বড় কনটেইনারের ব্যবহার কমেছে।

তবে এসব কেন্দ্রের অবস্থান, জায়গার সংকট, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কারণে নতুন ধরনের ভোগান্তিও তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য কেন্দ্রের বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বসতি ও চলাচলের এলাকায়।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে দুটি বড় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটির মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে মিথেন গ্যাস, সার, পশুখাদ্য এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী তৈরির উদ্যোগও রাখা হয়েছে।

দুই সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনায় পার্থক্য

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ তৈরির ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনায় মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রকল্পে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বর্জ্য না পুড়িয়ে বিভিন্ন ধাপে প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ ও একাধিক পণ্য তৈরির পরিকল্পনা করেছে।

ঢাকা উত্তরের প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে চীনের একটি পরিবেশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। দক্ষিণ সিটির প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠান।

এই দুই পদ্ধতির পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। পরিবেশবাদীদের একটি অংশ বিশেষভাবে বর্জ্য পোড়ানোর পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বাংলাদেশের নগর বর্জ্যের বড় অংশই ভেজা ও জৈব প্রকৃতির। এ ধরনের বর্জ্যের তাপ উৎপাদন ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় তা পোড়াতে অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হতে পারে।

এ ছাড়া প্লাস্টিকসহ রাসায়নিক উপাদানযুক্ত বর্জ্য পোড়ানোর সময় যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ক্ষতিকর গ্যাস ও দূষক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে বর্জ্য কমলেও বায়ুদূষণের নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

দক্ষিণ ঢাকার প্রকল্পে সাত ধরনের পণ্য

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনাটি বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির ধারণার ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য এই ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার সমপরিমাণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্জ্য পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি না করে বিভিন্ন আধুনিক প্রক্রিয়ায় সেগুলোকে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে রূপান্তর করা হবে।

প্রস্তাবিত উৎপাদন ব্যবস্থায় বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই গ্যাস ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দৈনিক হিসাবে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২২১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা।

এ ছাড়া প্রতিদিনের বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে পরিবেশবান্ধব জৈব সার, পোলট্রি ও মাছের খাবারের জন্য বিএসএফ প্রোটিন, প্রসাধনশিল্পে ব্যবহারের উপযোগী বিএসএফ তেল, পাইরোলাইসিস তেল, পাইরোলাইসিস ব্ল্যাক কার্বন, সলিড রিকভারড ফুয়েল এবং ইকো-ব্রিকস উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব পণ্যের মধ্যে বছরে প্রায় ৪১০ টন জৈব সার, ২০ টন বিএসএফ প্রোটিন, ১১ দশমিক ৫২ টন বিএসএফ তেল, ৪৭ হাজার ৭৭৫ লিটার পাইরোলাইসিস তেল, ৭ দশমিক ৩৫ টন পাইরোলাইসিস ব্ল্যাক কার্বন, ২৫৫ টন সলিড রিকভারড ফুয়েল এবং ১২৮ টন ইকো-ব্রিকস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগে বাস্তবায়নের উদ্যোগ

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্রকল্পটির মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে আগামী জানুয়ারি। প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ বছর।

চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, জমি সরবরাহের বাইরে প্রকল্পে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বড় ধরনের সরাসরি আর্থিক বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। প্রকল্পের মূল অর্থায়ন আসবে বিদেশি উৎস থেকে।

প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি থেকে পাওয়া মোট লভ্যাংশের ২০ শতাংশ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পাবে। পাশাপাশি প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত জায়গার ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে।

৪৫ একর জমিতে প্রকল্প

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। পুরো প্রকল্পের জন্য প্রায় ৪৫ একর জমি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১০ একর জমি প্রতিষ্ঠানটির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পটি নিয়ে সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। তবে এখনো বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ও সরাসরি সম্পৃক্ত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে বৈঠক হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি তা থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের চাপ কমিয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন নগরব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

প্রতি / এডি / শাআ

আরো সংবাদঃ

আর্কাইভ

October 2026
SSMTWTF
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
20G